ভোরবেলা বাসা থেকে বের হতে হচ্ছে ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে, আর ফিরবার পথে সূর্যের তাপে গা যেন পুড়ে যাচ্ছে…ইদানীং ওয়েদারেরও এত মুডসুইং হয়! অবশ্য ওয়েদারের দোষ-ই বা কি!
এই যে আমাদের whimsical weather, এর পেছনে কারণটা সবারই কম বেশি জানা "গাছ-বৃক্ষ"। গাছের উপকারিতার কথা আজ কারো অজানা নয়। প্রতিনিয়ত পেপার-পত্রিকা, সোস্যাল মিডিয়ায় গাছ নিয়ে কত শত লেখালেখি… কিন্তু শুধু অভাব গাছ লাগানোর। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ভাষায় বলতে হয়–
"এখানে অনেক গাছে গাছে ভরে আছে বাংলাদেশ
শুধু বৃক্ষই কমে গেছে কবে, চোখে পড়ে না…"
সত্যি চোখে পড়ে না… আমাদের দেশকে ছয়ঋতুর দেশ বলা হয়ে থাকলেও কালের বিবর্তনে তা এখন কাগজে কলমে আছে, বাস্তবে নেই বললেই চলে। স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি গরম পড়ছে এ বছর। এমনকি প্রচণ্ড গরমে রেললাইন বেঁকে গিয়েছে! হুটহাট ঝড়-বন্যা আবার তাপদাহ…।।বৃক্ষরোপণ অভিযান নামক কত উদ্যোগ নেয়া হয়…শুধুমাত্র ছবি তুলে পোস্টে রিচ বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষায়! বৃক্ষরোপণ রচনা কিংবা অনুচ্ছেদ ছাত্র-ছাত্রীদের মুখস্থ না করলে , পরীক্ষায় পাস(!) করা দায়...তবুও আমরা কি পেয়েছি আমাদের সেই সবুজে ঘেরা প্রিয় পৃথিবীকে ফিরিয়ে আনতে? তথাকথিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে!
গবেষণা জানিয়েছে, প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণে কার্বন জমা হয়েছে তার ২৫ শতাংশই বায়ুমণ্ডল থেকে সরে যাবে যদি আমরা দ্রুততার সঙ্গে এক লাখ কোটি গাছ লাগাতে পারি। আর এর ফলে বায়ুমণ্ডল হয়ে যাবে ঠিক ১০০ বছর আগেকার মতো!
এখন মনে হয়, বহুতল ভবনের উচ্চতার সাথে বৃক্ষের পত্রপল্লব পেরে ওঠে না। এমনটাই কি হওয়ার কথা ছিলো? কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে সবুজের সমারোহ? আল্লহ রব্বুল আলামীন আমাদের সৃষ্টির পূর্বে এ পৃথিবীকে আমাদের জন্য কতই না উত্তম নিয়ামত হিসেবে দিয়েছিলেন, অথচ আমরা সে নিয়ামত থেকে নিজেরাই আজ নিজেদের বঞ্চিত করছি...
"আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি ও তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উদ্গত করেছি, অনুরাগী সকল বান্দার জন্য জ্ঞানও উদাহরণস্বরূপ। আর আমি আকাশ থেকে কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং এর দ্বারা উদ্যান ও পরিপক্ব শস্যরাজি উদ্গত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়। আছে সমুন্নত খেজুরগাছ যাতে রয়েছে কাদি কাঁদি খেজুর, বান্দাদের জন্য রিজিক। বৃষ্টির পানি দ্বারা মৃত ভূমিকে জীবিত করি অনুরূপই পুনরুত্থান।" (সুরা-৫০ কাফ, আয়াত: ৭-১১)
"তিনি তোমাদের জন্য তা দিয়ে জন্মান শস্য, জয়তুন, খেজুরগাছ, আঙুর ও সব ধরনের ফল। অবশ্যই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন।" (সুরা-১৬ নাহল, আয়াত: ১১)
সবুজের নিয়ামত ফের ফিরে পাবার আকাঙ্ক্ষা সবারই।। কিন্তু ইট-পাথরের শহরে গাছ লাগাবার জায়গা কোথায়...এমন অজুহাতটাও আমাদেরই! অথচ আমরা যদি সদিচ্ছা পোষণ করি আর আন্তরিকতা থাকে তাহলে খুব দ্রুত এক লাখ কোটি গাছ লাগানো অসম্ভব কিছু নয়। আর এজন্য জায়গার অভাব বা গাছগুলো বেড়ে উঠা অথবা আল্লহর এই সুবিশাল ধরণীতে তাদের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হবে না। ইচ্ছে থাকলে আমরা আমাদের ফ্ল্যাট বা বাড়ির বারান্দা কিংবা ছাদেই গড়ে তুলতে পারি এক টুকরো সবুজ বাগান! যেখানে হবে নিয়মিত গাছ লাগানোর চর্চা। বারান্দায় বাগানের জন্য নার্সারিতে পাওয়া যায় নানা রকম বাহারি গাছ। ফুলের মধ্যে টগর, গোলাপ, অপরাজিতা, জুই, দোলনচাঁপা, অর্কিড, বেলি, হাসনাহেনা ,পাতাবাহারসহ অর্নামেন্টাল গাছ,...আবার হতে পারে সবজি-ও! এসব গাছ লাগাতে এখন আর তেমন সিজন দরকার হয়না...শুধু প্রয়োজন একটু সদিচ্ছার...। জুন-আগস্ট মাসের মধ্যে লাগানো গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। প্রয়োজনীয় রোদ, ছায়া, নিয়মিত পানি দেয়া গেলে বাসায় বৃক্ষরোপণ খুব কঠিন কিছু না। গাছ লাগানোটাই কঠিন কাজ(!)...রোপণের পর তা নিজ থেকেই সার্ভাইভ করতে শিখে যায়। বছরের নির্দিষ্ট একদিনকে বৃক্ষরোপণের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতি সপ্তাহে কিংবা মাসে একটি গাছ লাগানো এবং পরিচর্যা করার অভ্যাস আমাদের করা উচিত। একান্তই বারান্দা-ছাদ কিংবা খোলা জায়গা আশপাশে না পেলে নিজ রুমেও
লাগানো যায় গাছ-অ্যালোভেরা, আইভি লতা, পাতাবাহার, মানিপ্ল্যান্ট, ক্যাকটাস, বাহারি কচু, পাম, স্পাইডার প্লান্ট, চায়নিজ এভারগ্রিন, স্নেক প্লান্ট, বস্টন ফার্ন, ফিকাস, ইংলিশ আইভি। এরকম আরও নাম না জানা বিভিন্ন ঘরোয়া গাছ আছে। এসকল গাছ ঘর এবং বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের শুধু সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করেনা পাশাপাশি কক্ষের বায়ুকে বিশুদ্ধ রাখে। রুমের তাপমাত্রাকেও সহনীয় রাখতে সাহায্য করে। এসব ঘরোয়া গাছের পরিচর্যা তেমন করতে হয় না, তবে মাঝে মাঝে পানি দেয়া এবং হালকা রোদে রাখা দরকার। বারান্দা কিংবা ঘরোয়া গাছগুলোতে ৩মাস পরপর সার দেয়া যেতে পারে অথবা ভেজা চা-পাতা। মাঝে মাঝে খোলা মাঠ কিংবা নিজের কর্মস্থলের আশপাশেও দুই একটি গাছ লাগিয়ে রাখা যায়। রসূলুল্লাহ(স.) এর হাদীসটি সবাই জানি-
‘যদি কোনো মুসলিম একটি বৃক্ষ রোপণ করে অথবা কোনো শস্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকাস্বরূপ গণ্য হবে।’ (বুখারি: ২৩২০, মুসলিম: ১৫৬৩)
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, শহরাঞ্চলে আজকাল চারার মূল্যও আজ দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির শিকার...। তবুও আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে, একটি হলেও গাছ লাগানোর! কি হবে যদি এক মিনিটের জন্য পৃথিবীর সমস্ত গাছ ফটোসিনথেসিস-রেসপিরেশান বন্ধ করে দেয়! সভ্যতার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রয়োজনে আমাদের গাছ ব্যবহার করতে হয়, তবে বিনা প্রয়োজনে যাতে একটি গাছও ক্ষতিগ্রস্থ না হয়,সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। দুনিয়া ও আখিরাতে এজন্য আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটবে, আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।’ (আবু দাউদ: ৫২৪১, বায়হাকী: ৬/১৪০)
মানবসভ্যতার যতই উন্নয়ন হচ্ছে ততই কমছে গাছের সংখ্যা, প্রতিনিয়ত বেড়ে চলা জনস্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে লাগানো হচ্ছে না গাছ। ফলাফল ! সে তো অনুমেয় … চরম পরিবেশ বিপর্যয়।
আল্লহ রব্বুল আলামীন আমাদের মাফ করুন...। ফের সবুজের চাদরে জড়িয়ে নিন আমাদের প্রিয় গ্রহটিকে...।
*"সবুজের সমারোহে..."*
~ সৈয়দা সুলতানা সুইটি

Post a Comment