লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণের জানালা ঘেঁষে আমগাছটা থেকে কয়েকটা নিশাচর পাখির কূ কূ ডাক শুনা যাচ্ছে।
খানিকবাদে দক্ষিণ ঘরের দরজা খুলে একজন বৃদ্ধ মহিলা বের হয়ে আসলেন। নিস্তব্ধ রাতে কলপাড় থেকে পানি তুলার শব্দ কানে এসে বিঁধছে যেন। ওযু করে জায়নামাজে দাড়িয়ে গেলেন আছিয়া খাতুন।
একুলে তার আপন বলতে কেউ নেই।চেয়ারম্যানের বাড়ির দক্ষিণ কোণে একটা খুপরি ঘরেই তার একাকি বসবাস। চেয়ারম্যানকে কত অনুনয়-বিনয় করেছিলেন তিনি বয়স্ক ভাতাটা পাইয়ে দেওয়ার জন্য! কিন্তু কে শুনে কার কথা।
তকদিরের লিখনে চেয়ারম্যান আজ তারই খুপরি ঘরের পেছনে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে নিথর হয়ে পড়ে আছে।
শেষ যেবার চেয়ারম্যান এর কাছে এসেছিলেন তখন ও বরাবরের মতই আশ্বস্ত করেছিলেন তিনি। কিন্তু কাজ হয়নি।
দূরের মসজিদগুলো থেকে সুমিষ্ট সুরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
"আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম"
ভোরের আলো ফোটার সাথেই সাথেই এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিরা সব এসে ভিড় জমালো চেয়ারম্যান এর বিশাল বাড়িটায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই একে অপরের মাঝে কানাঘুঁষা শুরু হলো।
- 'আরে কি বলে এসব! চেয়ারম্যান এর বউ ছেলেমেয়ে সবাই উধাও। কেউ আসেনি লাশটাও দেখতে!'
আরেকজন বলে উঠলো, 'শুনেছি মৃত্যুর আগে চেয়ারম্যান তার সম্পত্তির সব কিছু বউকে দিয়ে গেছেন। যার বেশির ভাগই তো ছিলো জনগণের মেরে খাওয়া টাকা। অনেক পাওনাদার আছে তার। বউ বাচ্চারা আসলে যদি টাকার জন্য জনগণ ধরে ভাগ বসায় তাহলে তো আর রক্ষা নেই।'
- 'কিন্তু তাই বলে লাশটাও এসে দেখবেনা!'
- 'আরে ভাই ছেড়ে দাও। যেমন কর্ম তেমন ফল।'
সারাজীবন মানুষের হক মেরে খেয়েছে এখন মৃত্যুর সময় যাদের জন্য এসব করেছে সেই বউ সন্তানরাই এসে তাকে দেখলো না পর্যন্ত। দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন আছিয়া খাতুন।
কয়েকজন এসে লাশ দ্রুত দাফন করার জন্য তাগাদা দিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর পর এসে লোকজন ফ্রিজিং গাড়ির চারপাশে ভিড় জমাচ্ছে।
- 'সরেন, সরেন! যারা এখনও দেখেননি দেখে নেন। লাশ নিয়ে যাবো এখনই।'
জানাজা শেষে লাশ কবরস্থ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। আস্তে আস্তে দাফনের সব কাজ সম্পন্ন করে সবাই চলে আসলো।
শুধু রয়ে গেলো একজন।
একাকি নির্জন কবরে পড়ে আছে।
আছিয়া খাতুনের খুপরি ঘরের পিছন থেকেই চেয়ারম্যান এর কবরটা দেখা যায়। মৃত্যুর ঘন্টাখানেক আগে যখন চেয়ারম্যানকে বলা হলো icu তে নিতে হবে, তখন কত অনুনয়-বিনয় করে ডাক্তারের হাত ধরে বলছিলো সে,
'আমাকে ওখানে নিও না, শুনেছি ওখানে গেলেই বেশীরভাগ মানুষ বেঁচে ফিরেনা। আমি ওখানে যাব না। যত টাকা লাগে দিব তারপরেও আমাকে ওখানে নিও না।'
একটু থেমে আবারো বলেছিলো,
'ডাক্তার আমার বুকের ব্যথাটা দূর করে দাও! আমার যত টাকা আছে সব দিয়ে দিব তোমাকে। যত টাকা লাগে সব নিয়ে নাও। তারপরেও ভালো করে দাও।'
মৃত্যুর আগে কত অনুনয়-বিনয় কিন্তু আল্লাহ তো দুনিয়ায় কোন বান্দার নির্ধারিত সময়ের এক সেকেন্ড বেশী কিংবা কম কোনটাই দিবেন না। আছিয়া খাতুনের মনে মনে বললো,
'যে সময় থাকতে বুজলো না জীবন কী, তার মৃত্যু দেইখা জীবনরে চিনা কি লাভ! বিবেক বুদ্ধি তো আল্লাহ দিছেই এজন্য! জীবনরে কাজে লাগায়ে মৃত্যুরে যেন সহজ করা যায় ।'
চেয়ারম্যান বাড়িতে একদিন
✒️সুমাইয়া সুলতানা

إرسال تعليق